সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনে বিভিন্ন অর্জন আর নিজের কাজের নান্দনিক ভিন্নতার জন্য অনেক আগেই ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন বিখ্যাত মার্কিন সঙ্গীতরচয়িতা ও গায়ক বব ডিলান। এ সপ্তাহে তাঁকে নিয়ে তৈরি হল নতুন ইতিহাস। মার্কিন সঙ্গীত-ঐতিহ্যে অভিনব কাব্যিক অভিব্যক্তি সৃষ্টি করার জন্য বব ডিলানকে দেওয়া হল সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। আর এই প্রথমবারের মতো একজন সঙ্গীতশিল্পী সাহিত্যে নোবেলজয়ী হলেন।
সুইডিশ অ্যাকাডেমির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অবশ্য বিতর্ক শুরু হয়েছে। বহু গুণীব্যক্তি যেমন ডিলানের নোবেল প্রাপ্তিতে আনন্দ প্রকাশ করছেন, তেমনি আবার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো কবি বা লেখককে সাহিত্যে পুরস্কার না দেওয়া কতটা যৌক্তিক। এই প্রশ্ন তোলা কতটা প্রয়োজনীয় তা নিয়েও ভিন্নমত থাকবে। হয়তো এই সিদ্ধান্ত অনেকেই বিতর্কিত বলে আখ্যায়িত করবেন সামনের দিনগুলোতেও। কিন্তু আমরা দৃষ্টি দিতে পারি ডিলানের রচনার দিকে যা স্পষ্ট করবে কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ এবং কিভাবে তাঁর কাজ সঙ্গীতের নির্দিষ্ট সীমানা অতিক্রম করে মানুষের নান্দনিক এবং রাজনৈতিক বোধ প্রাণিত করতে সক্ষম হয়েছে।
আমরা দেখতে পাই জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিসরে অবস্থান করেও ডিলানের সঙ্গীত টিকিয়ে রেখেছে প্রগাঢ়তা, ফলে সাধারণ মানুষের বোধগম্য সংস্কৃতি আর অগভীর থাকেনি এবং এই সংস্কৃতির ভোক্তারা পরিচিত আর অভ্যস্ত হয়েছে চিন্তাশীল বক্তব্যের সঙ্গে। বব ডিলান তাই কেবল একজন গায়ক নন, তিনি একজন রচয়িতা। সঙ্গীতের মাধ্যমে যে শৈল্পিক এবং সমাজসচেতন ভাবনা সৃষ্টি করে অগণিত মানুষের মন তিনি প্রভাবিত করেছেন তা কোনো কবি বা ঔপন্যাসিকের একই ধরনের অবদানের চেয়ে কম হতে পারে না।
বব ডিলানের জন্ম ১৯৪১ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায়। তাঁর আসল নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। যখন তাঁর বয়স ১৮ তখন থেকে তিনি ‘বব ডিলান’ নাম ব্যবহার করতে থাকেন। পরে নিজের আত্মজীবনীতে ডিলান লিখেছেন বিখ্যাত কবি ডিলান টমাসের কবিতার প্রতি তিনি আকৃষ্ট ছিলেন। ডিলান টমাসের একটি সুন্দর কথা হল, “যখনই একটি ভাল কবিতা লেখা হয় পৃথিবী আর আগের মতো থাকে না।”
এই তাৎপর্যপূর্ণ কথাটি কবি ডিলান টমাসের অনুরাগী সঙ্গীতশিল্পী বব ডিলানের সৃষ্টিতেও আমরা লক্ষ করি। বব ডিলানের বিভিন্ন বিখ্যাত গানের কথা আর সুর তুলে ধরে তাঁর ভাবনার গভীরতা, কল্পনাশক্তির পরিচয়, সত্য প্রকাশের সাহস এবং এই গানগুলো কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফোক বা রক সঙ্গীতের পরিচিত পরিসরেই নতুন মাত্রা সংযোজন করেনি, সারা বিশ্বের বহু মানুষের মনে তা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
এই পরিবর্তন গতানুগতিকতার গণ্ডি ভেঙে দিয়ে নতুনভাবে মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, সমাজের যে অসঙ্গতি আর অন্যায় টিকে থাকার পরও মানুষের সচেতনতা দেখা যায় না– সেই নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য মানুষকে গভীর ভাবনার মুখোমুখি করা। ডিলান তাই একজন প্রতিবাদী শিল্পী। জীবনে প্রতিনিয়ত দেখতে পাওয়া জটিল দিকগুলো সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেছেন। কখনও সহজ ভাষায়, আবার কখনও অপ্রত্যক্ষভাবে যে অস্পষ্টতার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় পরাবাস্তব বক্তব্যের।
গিটার আর হারমোনিকা নিয়ে ফোক, ব্লুজ আর রক সঙ্গীতের জনপ্রিয় সুরে গান পরিবেশন করে মানুষকে তিনি শুধুই বিনোদন দেননি। তাঁর গানের কথা মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। যে ভাবনায় মানুষ উদ্যোগী হলে শক্তিশালী হবে মানবিকতাবোধ, আর সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা দেখব প্রতিরোধ।
ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিউবান মিসাইল সংকটকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ আর যুদ্ধ পরিস্থিতি, জাতিগত বিভেদনীতি আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর সিভিল রাইটস আন্দোলন জোরালো হওয়া প্রভৃতি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য মহাদেশের মতো মার্কিন তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছিল বৈপ্লবিক চেতনা আর প্রথাবিরোধিতার ঝোঁক। বব ডিলানের গানে মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী উডি গাথ্রির প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। গাথ্রি সঙ্গীত পরিবেশনের সময় যে গিটার ব্যবহার করতেন সেই গিটারে লেখা থাকত– ‘দিস মেশিন কিলস ফ্যাসিস্টস।’ অর্থাৎ, গাথ্রির জন্য গিটার শুধুই বাদ্যযন্ত্র নয়, তা ছিল ফ্যাসিবাদী অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা একটি অস্ত্র।
ডিলানও নিজের গান সাহসীভাবে ব্যবহার করেছেন সব ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করার জন্য। নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু অপর বিখ্যাত মার্কিন সমাজসচেতন সঙ্গীতশিল্পী জোয়ান বায়েজের সঙ্গে ষাটের দশকের শুরু থেকেই দেশে চলমান সিভিল রাইটস মুভমেন্টের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে থাকেন ডিলান।
